বৃষ্টিভেজা বিকেলের ভালোবাসা

 

বৃষ্টিভেজা বিকেলের ভালোবাসা





বিকেলের আকাশটা সেদিন হঠাৎ করেই কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। শহরের ব্যস্ত রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছিল, আর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ যেন চারপাশে এক অন্যরকম শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

মেহরাব ছাতা ছাড়াই বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল। অফিস থেকে বের হতে দেরি হয়ে যাওয়ায় সে ভিজেই বাড়ি ফিরবে ভেবেছিল। ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল নীলা। হাতে ছোট্ট একটা নীল রঙের ছাতা।

নীলা হেসে বলল,
— এতক্ষণ ধরে ভিজছ কেন?

মেহরাব একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— ছাতা আনতে ভুলে গেছি। ভাবলাম, বৃষ্টি তো থামবেই।

নীলা মৃদু হেসে ছাতাটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— বৃষ্টি সব সময় থামে, কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে অনেক সময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়।

দুজন একই ছাতার নিচে হাঁটতে শুরু করল। চারপাশে ভেজা মাটির গন্ধ, রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে আলো ঝিকমিক করছিল। কথা বলতে বলতে তারা বুঝতেই পারল না কতটা পথ পেরিয়ে এসেছে।

মেহরাব অনেকদিন ধরেই নীলাকে পছন্দ করত, কিন্তু কখনো সাহস করে কিছু বলতে পারেনি। নীলার সরল হাসি আর যত্নশীল স্বভাব তাকে প্রতিদিন নতুন করে মুগ্ধ করত।

হাঁটতে হাঁটতে নীলা হঠাৎ বলল,
— জানো, ছোটবেলায় আমি বৃষ্টিকে খুব ভালোবাসতাম। মনে হতো, বৃষ্টি সব দুঃখ ধুয়ে নিয়ে যায়।

মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— তাহলে আজ আমার একটা দুঃখও ধুয়ে নিয়ে যাক।

নীলা অবাক হয়ে তাকাল।
— কী দুঃখ?

মেহরাব গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
— অনেকদিন ধরে একটা কথা বলতে চাইছি, কিন্তু ভয় পাই। যদি তুমি দূরে সরে যাও?

নীলা নরম স্বরে বলল,
— না বলে কি কখনো জানা যায়?

মেহরাব মৃদু কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— আমি তোমাকে ভালোবাসি, নীলা। তোমার সঙ্গে কথা বললে আমার দিনটা ভালো হয়ে যায়। তোমার হাসি দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা এখনও সুন্দর। আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে, কিন্তু আমি চাই তোমার পাশে থেকে প্রতিটা সকাল আর প্রতিটা বৃষ্টিভেজা বিকেল কাটাতে।

কিছুক্ষণ নীলা নীরব রইল। বৃষ্টির ফোঁটা ছাতার ওপর পড়ে টুপটাপ শব্দ তুলছিল। তারপর সে ধীরে ধীরে মেহরাবের হাতটা ধরল।

— আমিও অনেকদিন ধরে এই কথাটাই শুনতে চেয়েছিলাম।

মেহরাব বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল।

নীলা মিষ্টি হেসে বলল,
— ভালোবাসা হয়তো বড় বড় প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং এমন ছোট ছোট মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে। কারও জন্য অপেক্ষা করা, ভিজে যাওয়ার ভয় না পেয়ে পাশে হাঁটা, আর নিঃশব্দে তার খোঁজ নেওয়ার মধ্যেই ভালোবাসার আসল সৌন্দর্য।

সেদিন বৃষ্টি অনেক রাত পর্যন্ত ঝরেছিল। কিন্তু তাদের দুজনের মন ভরে গিয়েছিল এক উষ্ণ অনুভূতিতে। শহরের ভেজা রাস্তাগুলো যেন নতুন করে সাক্ষী হয়ে রইল একটি সাধারণ অথচ সত্যিকারের ভালোবাসার গল্পের—যেখানে ছিল না কোনো নাটকীয়তা, ছিল শুধু দুটো মানুষের আন্তরিক অনুভূতি আর একসঙ্গে পথ চলার নীরব প্রতিশ্রুতি।

Post a Comment

0 Comments